ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা: ভারতবর্ষে আগমন - বিশ্বের ইতিহাস বাংলায়

ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের আগমন বিশ্বের ইতিহাস বাংলায় 

বিশ্বের অন্যতম প্রচীন সভ্যতার লীলভূমি ভারতবর্ষ উপমহাদেশ।  এর অফুরন্ত সম্পদ এবং ঐশ্বর্য যুগে যুগে বিদেশিদের করেছে আকৃষ্ট। তাই বহু প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষ উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতির আগমন ঘটেছে সম্পদ গ্রহণ করার আশায়। কেউ ভারতবর্ষে আগমন করেন হানাদানর রূপে,  আবার কেউ বণিক বেশে। ভারতবর্ষ উপমহাদেশের অতুল ঐশ্বর্য ও ধনসম্পদ খবর পেছে বিদেশিরা এরপরই তারার ব্যবসায় উদ্দেশ্য অন্যান্য জাতির মত ইউরোপীয় এই দেশে আগমন ঘটেছে ছিল। এখন এর বিস্তারিত জানবোঃ

ভারতবর্ষে আগত ইউরোপীয় কোম্পানীসমূহঃ

বহু প্রচীনকাল থেকে পাশ্চাত্য দেশগুলোর সাথে উপমহাদেশে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক ছিল। ক্রুসেডের পর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ইতালির  ভেনিস, ফ্লোরেন্স জেনোয়া প্রভৃতি নগর রাষ্ট্রগুলো এশিয়া মাইনরের শহরগুলোতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার লাভ করেছিল।

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে তুরস্ক কনস্টান্টিনোপল অধিকার করে ভূমধ্যসাগরীর অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করলে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে উপমহাদেশের ব্যবসায় বাণিজ্যিক পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। সমগ্র ইউরোপীয় দেশসমূহে ভারতীয় দ্রব্য সামগ্রী বিশেষ করে মসলা সোনা রুপার চাহিদা অত্যধিক অনুভুত হওয়ায় তারা ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে নতুন পথের সন্ধান করেছিল।

মানচিত্র ভাস্কো-দো-গামা কর্তৃক নতুন পথের আবিষ্কারঃ

পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপ মহাদেশের ভৌগোলিক আবিস্কার এবং পর্তূগিজ শক্তির উত্থান ঘটায় তাঁরা দুঃসাহসিক আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে।  ইউরোপীয় জাতিসমূহে মধ্যে পর্তুগিজগণ ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসী এবং নৌবিদ্যায় পারদর্শী। 

১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে নাবিক বার্থলামিউ দিয়াজ উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আসেন। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ২০ মে তিনি উপমহাদেশের কালিকট বন্দরে এসে উপস্থিত হন। ভাস্কো-দো-গামার উপমহাদেশে আগমনের সাথে ইউরোপের সঙ্গে এ দেশের প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

পর্তুগিজ কোম্পানিঃ ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-দো-গামার উপমহাদেশ আগমন ভৌগোলিক আবিস্কার দিক দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভাস্কো-দো-গামার যখন কালিকট বন্দরে অবতরণ করেন তখন সে খানকার স্থানীয় রাজা জামোরিক তাঁকে আতিথেয়তা প্রদান করেন। এতে আরব বণিকগণ ঈর্ষান্বিত হয়ে পর্তুগিজদের বিরোধিতা করতে থাকে। 


ভাস্কো-দো-গামার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে পেড্রো আল-ভারেজ কাব্রাল তেরটি নৌবহরসহ উপমহাদেশে আগমন করেন।

কালিকটের রাজা জামোরিক তাঁকে যথাযথ আতিথেয়তা প্রদান করেন। কিন্তু তিনি আরব বণিকদের প্রতি ক্রমাগত দমননীতির ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় মুসলমান, গুজরাট ও মিসরের সুলতানের সাহায্যে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু পর্তুগিজ বাণিজ্য জাহাজগুলো আধুনিক রণতরীর মতোই কামান দ্বারা সুসজ্জিত থাকায় কালিকটের রাজার সম্মিলিত বাহিনী পর্তুগিজদের নিটক শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

ভারতীয় রাজন্যর্গের রাজনৈতিক দুর্বলতা সম্মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পর্তুগিজদের কাছে। ফলে তারা ভারতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। কাব্রালের উপমহাদেশে ত্যাগের পর ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-দো-গামা পুনরায় ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। এবং কোচিন ও ক্যানোনোরে দুটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। এরপর পর্তুগিজগণ বছরে একজন করে পতিনিধি প্রেরণ করেন ভারতীয় বাণিজ্যকুঠিগুল তদারক করার নীতি প্রবর্তন করেন।

ভারতীয় বাণিজ্য কুঠিগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে ফ্রান্সিকো ডি-আল মিডার প্রত্যাবর্তনের পর আলবুকার্ক উপমহাদেশে পর্তুগিজগণ খুব সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আলবুকার্ক পর্তুগিজ গভর্নরদের মধ্যে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।  ভারতীয় উপমহাদেশের রাজন্যবর্গের দুর্বলতার সুযোগে আলবুকার্ক উপমহাদেশে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। এ উদ্দেশ্য তিনি বিজাপুরের সুলতানের নিটক থেকে গোয়া দখল করে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য কেন্দ্র ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলেন। 

এর পর তিনি  মালাক্কা এবং হুরমুজ দখল করে কোচিনে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেন। ভারতীয় জনগণের প্রতি পর্তুগিজদের অত্যাচার, উৎপীড়ন সত্ত্বেও তিনি ভারতে একটি স্থায়ী পর্তুগিজ সমাজ গড়ে তুলেন জন্য ভারতীয় মহিলাদের বিয়ে করার নির্দেশ দেন। পর্তুগিজদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করেন এবং তিনি ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।  তার উত্তরাধিকারিগণ দিউ, দমন, কালিকট, কোচিন, বোম্বাই, সিংহল, হুগলি এবং বঙ্গদেশে শক্তিশালী বাণিজ্য কুঠি স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। 

পর্তুগিজদের পতন

ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগিজগণ সর্বপ্রথম উপমহাদেশে আগমন করে। উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী দুর্গ এবং বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। কিন্তু ভারতীয়দের প্রতি ক্রমে তাদের দুর্ব্যবহার এবং উৎপীড়ন পর্তুগিজদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমতঃ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং অধিকৃত অঞ্চলসমূহের জনগণের প্রতি অমানুষিক উৎপীড়ন পর্তুগিজদের পতনের অন্যতম কারণ। জোরপূর্বক হিন্দু-মুসলমান বালক-বালিকাকে অপহরণ করে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিতকরণ অথবা দাস-দাসীতে পরিণত করা, সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের দুজন পরিচারিকাকে অপহরণ করার মতো ধৃষ্টতা সম্রাটকে উত্তোজিত করে তোলে। সম্রাট ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে কাসিম থানের নেতৃত্ব এ অবাঞ্ছিত বিদেশিদেরকে হুগলি হতে বিতাড়িত করেন।

দ্বিতীয়তঃ উপমহাাদেশের অধিকৃৃৃত অঞ্চলসমূহে পর্তুগিজদের   শাসন ছিল কলুষিত এবং দুর্নীতিপরায়ণ। তারা নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় জনগণের নিকট থেকে অতিরিক্ত কর এবং  উৎকোচ গ্রহণ করতো। তাদের নিষ্ঠুর ব্যবহার এবং উদ্ধত  আচরণ এদেশে পর্তুগিজ শাসনের পরিপন্থী ছিল।

তৃতীয়তঃ পর্তুগিজ সরকার আলবুকার্কের পর অপর কোনো প্রতিভাসম্পন্ন গভর্নর উপমহাদেশে প্রেরণ করতে পারেননি। পরবর্তী পর্তুগিত গভর্নরদের অদূরদর্শিতা তাদের পতনের অন্যতম কারণ ছিল পর্তুগিজদের পতনে। 

চতুর্থতঃ ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় ফিলিপস-এর নেতৃত্বে স্পেন ও পর্তুগাল একত্রিত হয়ে ওলন্দাজ ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে স্পেন ও পর্তুগাল প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সুদূর ভারতে তাদের রাজ্য রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয় নি।

পঞ্চমতঃ এ সময় আরও তিনটি ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। তারা হলো,  ওলন্দাজ,  ফারসি, ইংরেজ। তারা পরম্পর বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত থাকায় তাদের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। পরস্পর শক্তি পরীক্ষায় লিপ্ত হয়ে পর্তুগিজগণ উপমহাদেশে গোয়া, দমন এবং দিউ ব্যতীত সমস্ত বাণিজ্য কুঠিগুলো হারিয়ে ফেলে। শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে পর্তুগিজদের অপসারণে ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ ও ফারসি শক্তিই প্রবল হয়ে ওঠে।

ষষ্ঠতঃ স্বদেশ হতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্যের অভাবে পর্তুগিজ কোম্পানি তাদের নিয়ম - শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে। তারা গোপনীয়ভাবে নানা প্রকার অবৈধ ব্যবসায় বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মুঘল সম্রাট আকবরের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পর্তুগিজদের অগ্রগতি ব্যাহত হয়ে পড়ে।

এই ভাবে ভারতবর্ষে আগমন ইউরোপীয় পর্তুগিজের পতন ঘটে। আর সকল ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হবে পরবর্তী পোস্ট গুলোতে আমাদের সঙ্গে থাকুন। ধন্যবাদ 

শেয়ার করুন